সিআইডিকে মামলা তদন্তের নির্দেশ

ঈদগাঁও বাজারের মেসার্স জামান পলিথিন স্টোরের ম্যানেজার মোঃ মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে ৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা আত্মসাত

প্রকাশ: ১ নভেম্বর, ২০২৬ ১০:১৪

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঈদগাঁওয়ে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় জাল চুক্তিপত্র তৈরি করে পৃথক ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া এবং বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আদালতে মামলা হয়েছে। ম্যানেজার, তাঁর স্ত্রী ও দুলাভাইকে আসামি করে কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (ঈদগাঁও) আদালতে এ অভিযোগ দাখিল করেছেন প্রতিষ্ঠানের মালিক। মামলাটি আমলে নিয়ে আদালত সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
রোববার (১ নভেম্বর) দাখিল করা মামলার বাদী আশরাফুজ্জামান বাবু ঈদগাঁও হাইস্কুল মার্কেটের “মেসার্স জামান পলিথিন স্টোর”-এর স্বত্বাধিকারী।
মামলায় তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদের পশ্চিম মুহুরীপাড়ার মৃত আবুল হোসেনের ছেলে মোঃ মহিউদ্দিন, তাঁর স্ত্রী মিসকাতুল জান্নাত রিফা এবং চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার করায়ানগর ইউনিয়নের ছোট বারোদুনার আদু মুহুরী পাড়া গ্রামের আলী আহমদের ছেলে আবদুল শুক্কুর। মহিউদ্দিন ওই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার ছিলেন। আবদুল শুক্কুর মহিউদ্দিনের দুলাভাই। মামলায় দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪০৬, ৪০৮, ৪০৯, ৪১১, ৪১৪, ৪২০, ৪৬৫, ৪৬৮, ৪৭১, ৫০৬(২), ১২০খ, ১০৯ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব জব্দ করে অর্থ আদায়ের প্রার্থনা করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, পিতার মৃত্যুর পর আশরাফুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছিলেন। ব্যবসার পাশাপাশি চাকরির প্রয়োজনে চট্টগ্রামে থাকায় তিনি মহিউদ্দিনকে ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে দোকানের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। মালামাল ক্রয়-বিক্রয়, বিক্রয়লব্ধ অর্থ গ্রহণ ও জমা, গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওনা আদায়, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের লেনদেনসহ যাবতীয় আর্থিক কার্যক্রমের দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। বাদীর অভিযোগ, মালিকের অজ্ঞাতসারে ও অনুমোদন ছাড়া মহিউদ্দিন বিক্রয়লব্ধ অর্থ ও গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা টাকার বড় অংশ প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত হিসাবে জমা না দিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুরু করেন। এই কার্যক্রম আড়াল করতে তিনি প্রতিষ্ঠানের গোডাউনকে নিজের নামে ভাড়া নেওয়া দেখিয়ে একটি জাল ভাড়াটিয়া চুক্তিপত্র তৈরি করেন।
মামলায় বলা হয়, জাল চুক্তিপত্রের বিষয়টি জানার পর বাদী গোডাউনের মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তিনি কোনো ভাড়া চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেননি। অভিযোগ অনুযায়ী, আবদুল শুক্কুরের সহায়তায় মহিউদ্দিন ওই জাল দোকান ভাড়া চুক্তিপত্র তৈরি করেন এবং চুক্তিপত্রে আবদুল শুক্কুর সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন। বাদীর দাবি, ওই চুক্তিপত্র ব্যবহার করে ২০২৪ সালে ৪নং ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে “মেসার্স আনান এন্টারপ্রাইজ” নামে পৃথক একটি ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়, যা পরে নিয়মিত নবায়ন করা হয়। সর্বশেষ নবায়ন হয় ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে মহিউদ্দিন ইসলামী ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংকের ঈদগাঁও শাখায় “এম/এস আনান এন্টারপ্রাইজ” নামে দুটি চলতি হিসাব খোলেন। ইসলামী ব্যাংকের হিসাবে প্রায় ৪ কোটি ৮৭ লাখ ৩৯ হাজার টাকা এবং পূবালী ব্যাংকের হিসাবে প্রায় ৪১ লাখ ২৯ হাজার টাকা জমা করে পরে তা সরিয়ে ফেলে আত্মসাৎ করেন। এ ছাড়া মহিউদ্দিনের স্ত্রী একজন গৃহিণী এবং তাঁর কোনো আয়ের উৎস না থাকলেও তাঁর নামে ইসলামী ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবে প্রায় ৪৯ লাখ ৮২ হাজার টাকা জমা করা হয়। একইভাবে ইউনিয়ন ব্যাংকে মহিউদ্দিনের নিজ নামের হিসাবে প্রায় ১ কোটি ৬৯ লাখ ৫৯ হাজার টাকা এবং পূবালী ব্যাংকে তাঁর নিজ নামের আরেকটি হিসাবে প্রায় ২৯ লাখ ৮৩ হাজার টাকা জমা ও স্থানান্তর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া নামে-বেনামে ওই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও করেছেন বাদী।
বাদী আরও অভিযোগ করেন, আত্মসাৎকৃত অর্থের একটি অংশ আবদুল শুক্কুরের মাধ্যমে ঈদগাঁও ইসলামপুরের মিতালী সল্টসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীর মাধ্যমে লবণের ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। আবদুল শুক্কুর অর্থের উৎস জেনেও তা গ্রহণ করে ব্যবসায় খাটিয়েছেন এবং উৎস গোপনে সহায়তা করেছেন বলে অভিযোগ। মহিউদ্দিনের স্ত্রী জেনেশুনে নিজের হিসাবে অর্থ গ্রহণ ও রক্ষণ করেছেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। বাদীর হিসাবে, আত্মসাতের মোট পরিমাণ প্রায় ৭ কোটি ৭৭ লাখ ৯৪ হাজার ২৬০ টাকা। এর মধ্যে মহিউদ্দিন তিন দফায় ৩০ লাখ টাকা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ফেরত দিয়েছেন। বাকি অর্থ উদ্ধার হয়নি। এর বাইরে ম্যানেজার থাকাকালে মালিকের অজ্ঞাতসারে বিভিন্ন পার্টির কাছ থেকে মালামাল কিনে প্রায় ৯৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকার দেনা সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ক্রেতার কাছে প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৬ লাখ ১৭ হাজার টাকা বকেয়া পাওনা আছে।
মামলায় বলা হয়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর (২০২৬) বিভিন্ন সূত্রে বাদী “মেসার্স আনান এন্টারপ্রাইজ” ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের বিষয়ে জানতে পারেন। বিষয়টি জানাজানি হলে মহিউদ্দিন আর্থিক অনিয়মের কথা স্বীকার করে পাঁচটি হিসাবের স্টেটমেন্ট বাদীকে দেন। ওই স্টেটমেন্ট ও দোকানের হিসাব পর্যালোচনা করে বাদী হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের অসংগতি পান। অভিযোগে বলা হয়, একই দিন আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে মহিউদ্দিন ইসলামী ব্যাংকের “আনান এন্টারপ্রাইজ” হিসাব থেকে নগদ ৯ লাখ টাকা তুলে নেন। এ ছাড়া পূবালী ব্যাংকের দুটি হিসাব থেকে সিটি জোন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা ও ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা স্থানান্তর করেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি নিজের আত্মীয়ের ব্যাংক হিসাবেও আত্মসাৎকৃত অর্থ পাঠিয়েছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীর দাবি, গত ৯ অক্টোবর (২০২৬) সাক্ষীদের উপস্থিতিতে মহিউদ্দিন অর্থ আত্মসাতের সমস্ত দায় স্বীকার করে একটি অঙ্গীকারনামা ও দায়স্বীকারপত্র সম্পাদন করেন। তাতে তিনি ৯৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকার দেনা ব্যক্তিগত দায় হিসেবে স্বীকার করেন এবং ক্রেতাদের কাছে পাওনা অর্থ আদায় করে প্রতিষ্ঠানের হিসাবে জমা দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। শর্ত ভঙ্গ হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও তিনি সম্মত হন। জামানত হিসেবে তিনি ইউনিয়ন ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংকের দুটি স্বাক্ষরিত চেক বাদীকে দেন।
মামলায় বলা হয়, অঙ্গীকারনামা অনুযায়ী পুনরায় দোকানের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার পর মহিউদ্দিন ১০ ও ১১ অক্টোবর, মাত্র দুই দিন ব্যবসা পরিচালনা করেন। এরপর থেকে তিনি বিনা নোটিশে অনুপস্থিত আছেন। এতে ব্যবসা পরিচালনায় ব্যাপক বিঘ্ন ও আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বলে বাদীর দাবি। বাদীর আশঙ্কা ছিল, মহিউদ্দিন প্রতিষ্ঠানের দেনা-পাওনা, মজুদ মালামাল, হিসাবপত্র ও নথিপত্রের ক্ষতিসাধন বা গোপন করতে পারেন, কিংবা আত্মগোপনে যেতে পারেন। এ আশঙ্কায় গত ২২ অক্টোবর আইনগত অধিকার সংরক্ষণের লক্ষ্যে বাদী ঈদগাঁও থানায় লিখিতভাবে বিষয়টি জানান (এসডিআর নং ১৬২০)। মামলায় অভিযোগ করা হয়, থানা থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মহিউদ্দিন ফোন রিসিভ করেননি এবং বাড়িতে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীর দাবি, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অভিযুক্তরা অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, জালিয়াতি, জাল দলিল আসল হিসেবে ব্যবহার ও ষড়যন্ত্রের মতো অপরাধ করেছেন।
মামলাটি দাখিলের পর আদালত তা আমলে নিয়েছেন এবং ঘটনার তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন সিআইডি (অপরাধ তদন্ত বিভাগ) কক্সবাজারকে। আদালত সিআইডি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।